,
সংবাদ শিরোনাম :
» « নড়িয়া ও জাজিরা কে পদ্মার অব্যাহত ভাঙ্গন থেকে বাঁচাতে জার্মানে মানব বন্ধন» « শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে রংপুরে স্পীকারের আহবান» « শিক্ষার নিয়ন্ত্রনে নয়, শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে শিক্ষা ———হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি» « সরকার সংবিধানের বাইরে এক চুলও নড়বে না-» « শ্রীনগরে হেরোইনসহ নারী মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার» « প্রবাসীদের কল্যানে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই – স্পেনে ড.বিদ্যুৎ বড়ুয়া» « ঠাকুরগাঁওয়ের মোহিনী তাজ বাড়ির পার্কে চলছে অসামাজিক কার্যক্রম» « ‘জয় বাংলা ইয়্যুথ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮» « বৃদ্ধি পাচ্ছে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পরিমাণ» « বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে

স্বার্থপর নিষ্ঠুর সমাজের উৎপাদন ধর্ষক

আলোরকন্ঠ রিপোর্টঃ টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রী রূপা খাতুনকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চার আসামির মৃত্যুদণ্ড ও একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গত সোমবার টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া এ রায় দেন। ঘটনার ১৭৩ দিন আর মামলার ১৭১ দিনের মাথায় আলোচিত এ মামলার রায় হলো। বেশ দ্রুততম সময়েই এই রায়টি হল।

কেন ধর্ষণ হয়? এই কাণ্ডটি আসলে এক ধরনের ক্ষমতার উল্লাস। ধর্ষকের মনস্তত্বে একটা ধারণা থাকে যে, মেয়েদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে, বাধার বিরুদ্ধে, তার শরীরটাকে তছনছ করা যেন পুরুষেরশক্তির জয়, তার আধিপত্যের সুপ্রতিষ্ঠা। চোরাচালান, জালিয়াতিসহ নানা দুর্নীতির মাধ্যমে বা এক একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে যে সমস্ত রাস্তার লোক আকস্মিকভাবে ধনিক শ্রেণিতে চলে গেছে, তারা আসলে সর্বোচ্চ এটুকুই পারে। তাদের উপভোগের দর্শন হলো ধর্ষণ।

‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষকরা ভিকটিমদের মুখ বন্ধ রাখতে প্রাণনাশের হুমকি দেয। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলা হয় না, হলেও আনেক দেরী হয়ে যায়। আসামিরা ঘুরে, ফিরে। হয়তো নতুন কোনও শিকারের ধান্দা করে। বেশিরভাগ ধর্ষকই গ্রেফতার হয় না। আসামিরা প্রভাবশালী হলেতো কথাই নেই।’

একা একা শুধু নয়। দলবেঁধে রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। সংখ্যা যত বেশি, জয়ের উত্তেজনাও ততো বেশি। কেউ কেউ আছে মেয়েদের গণধর্ষণের ভিডিও তুলে রাখে, নেটে ছড়িয়ে দেয়। বনানীর চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনার কথা যদি স্মরণ করি তাহলে দেখে এই তোলপাড় করা ঘটনা শুধু একটি, দুটি না, ঘটছে বারবার। এই বনানীতেই সেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা ঘটনার পর আরও দুটি ঘটনা ঘটেছে একই রকম। জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ।

এই ধর্ষণকারীরা কোনও হঠাৎ রাগের উত্তেজনায় কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলেছে, এমন নয়। হ্যাঁ রাগ ছিল, কিন্তু সে এক অন্যরকম রাগ। ধনীর দুলাল, সবকিছু এদের দখলে বাপেদের অনার্জিত টাকায়। তাই তাদের মানসিকতা হলো, নারীর শরীর চাইলে তাকে দিতে হবে, না দিলে জোর করে আদায় করা হবে যেন এটা তার পাওনা।

তবে ধর্ষণতো শুধু ধনীর দুলালরাই করে না, করে সব শ্রেণির পুরুষই। পুরুষত্ব ও পুরুষাঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য তারা ধর্ষণ করে। এ এক অদ্ভুত মনস্তত্ব। ক্ষমতা, আধিপত্য বিস্তার, রাগ, বিপন্নতা, হঠাৎ যৌন উত্তেজনা কিংবা শুধুই ফুর্তির আকাঙ্ক্ষায় এরা এসব করে। আসলে এসব পুরুষ মেয়েদের ঘৃণা করে। ধ্বংসাত্মক, আগ্রাসী সেই ঘৃণা। এই ঘৃণার সংস্কৃতি এদের মনোজগতে ভর করে পরিবারের ভেতরেই।

পরিবার থেকেই এরা মেয়েদের যৌন-পুতুল হিসেবে দেখতে শেখে। মেয়েদের তুচ্ছ ও ঘৃণা করার সিলেবাস সমাজের স্তরে স্তরে। একট হেট ক্যাম্পেইন আছে যেখানে প্রগতিশীলরাও বলে থাকে মেয়েরা যেন রাতে বাইরে না যায়। আর এক ধর্মান্ধ গোষ্ঠীতো আছেই যারা হয়তো এতক্ষণে কত ওয়াজই না করে চলেছেন যে, ‘বেআব্রু’ মেয়েদের কপালে এটাই জুটে।

অনেকেই আবার নানা যুক্তিতে ধর্ষিতাদের নিয়েই কটুক্তি করে। কিন্তু তারা মনে রাখেনা যে, তাদের ঘরেও নারী আছে, তাদেরও অনেকের কন্যা আছে। ভুলে গেলে চলবে না যে, ধর্ষণকারীর প্রতি এমন সহানুভূতি, এমন প্রশ্রয় ‘যাকে পাবি তাকে খা’-এর মতো সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে। ধর্ষণে অভ্যেস করে ফেলার প্রচেষ্টা ধর্ষিতা নারীকে খারাপ প্রমাণ করার এই মনোভাব কিন্তু তাদেরও ছাড়বে না যারা ভিকটিমদের নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে একেকজন রসময় গুপ্ত হয়ে উঠছেন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষকরা ভিকটিমদের মুখ বন্ধ রাখতে প্রাণনাশের হুমকি দেয। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলা হয় না, হলেও আনেক দেরী হয়ে যায়। আসামিরা ঘুরে, ফিরে। হয়তো নতুন কোনও শিকারের ধান্দা করে। বেশিরভাগ ধর্ষকই গ্রেফতার হয় না। আসামিরা প্রভাবশালী হলেতো কথাই নেই। পুলিশ তাদের ধরতে সংকোচ বোধ করে। এসব দেখে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে আমাদের সামাজিক সুস্থতা নিয়ে।

কি গ্রাম, কি শহর বা বড় শহর। ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পুরুষ সবসময় উদ্যত। তারা টাকা পয়সা দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করে। নইলে ভয় দেখিয়ে চুপ করানোর পথ খুঁজে। এ ধরনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা জোরালো ভূমিকা না নিলে ভিকটিমের বিচার পাওয়া আসলেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

ধর্ষক আসলে এই স্বার্থপর নিষ্ঠুর সমাজের উৎপাদন। ধর্ষিতাকে এ সমাজ, পরিজন, এমনকি সে নিজে কী চোখে দেখে তা আমরা জানি। এ সমাজ ধর্ষিতার মৃত্যুকামনা করে, আর ধর্ষকের জয়গান গায়। এমন এক বাস্তবতার পরও মেয়ে দুটি সাহস করে আইনের আশ্রয় চেয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ হয়। দু’একটি মূল ধারা গণমাধ্যমও সক্রিয়। এতে বোঝা যায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষকে লিঙ্গপরিচয়ের ঊর্ধ্বে দেখার চোখ তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু সত্যি বলতে কী- নারীকে হেয় করে দেখে যে সমাজ, তার ব্যাপকতার তুলনায় এই দৃষ্টিভঙ্গি অতি ক্ষুদ্রপরিসর। এই দেশে ধর্ষিতাকে শাস্তি দেওয়ার আইন নেই কিন্তু রেওয়াজ আছে। ‘ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধ ধর্ষকের, দোষ, পাপ, অন্যায়, অনৈতিকতা ধর্ষকের’, এই জরুরি কথাটি উচ্চারিত হতেই হবে সবসময়, সব খানে, সব ঘটনায়। অন্যথায় পুরুষ কোনদিন শিখবে না, মা-বোন ছাড়াও একটি মেয়ের সঙ্গে সম্প্রীতি সসম্মান সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : বার্তা পরিচালক, একাত্তর টিভি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com