,
সংবাদ শিরোনাম :

২৪ বছর পর দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার বাধা ইউরোপ!

আলোরকন্ঠ রিপোর্টঃ সাদা চোখে আজকের দিনটিও অন্য আট দশদিনের মতই। অন্য দিনের সঙ্গে আজকের সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতের রূপেও খালি চোখে ভিন্নতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে যারা ফুটবল অনুরাগি, বিশেষ করে লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভক্তদের কাছে ২০১৮ সালের ৩০ জুন শনিবার দিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেন অন্যরকম? তার কারণ ব্যাখ্যার দরকার আছে কি?

আজ যে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্ব শুরু! গ্রপ পর্ব শেষে বিশ্বকাপের ‘সাডেন ডেথ’ মানে নকআউট পর্বের প্রথম দিন শনিবার। রাত ৮টায় ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ বিজয়ী ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামবে মেসির আর্জেন্টিনা। আর মধ্যরাতে প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের মুখোমুখি হবে রোনালদোর পর্তুগাল।

জিতলে কোয়ার্টার ফাইনাল, মানে সেরা ১৬ দল থেকে শীর্ষ আটে পৌঁছে যাওয়া। আর হারলেই বিদায়- সহজ সমীকরণ। সারা বিশ্বে আর্জেন্টিনা ও মেসির কোটি কোটি ভক্ত উন্মুখ অপেক্ষায়। বাংলাদেশেও আজ এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য। উত্তেজনা। উৎসাহ-উদ্দীপনা। গোটা দেশে রীতিমত উৎসবমুখর পরিবেশ।

তবে আর্জেন্টিনা ও মেসি সমর্থকদের সবাই যে উৎসব আমেজে, তাও বলা সম্ভবত ঠিক হবে না। তাদের অনুভুতি ভিন্ন। কেউ কেউ নকআউট পর্বে প্রিয় দল ও পছন্দের খেলোয়াড়ের খেলা দেখার অপেক্ষায়। সেটা রীতিমত রোমাঞ্চে ভরা।

কারো কারো স্বপ্ন সাদা আর আকাশী জার্সিধারীরা যাবে আরও অনেকদুর। তাদের কাছে আজ ফ্রান্সের সাথে আর্জেন্টিনার ম্যাচ হচ্ছে স্বপ্ন পূরণের পথে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাবার লড়াই। আবার কেউবা খানিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। তাদের চিন্তা- ‘আচ্ছা আর্জেন্টিনা নক আউট পর্বের প্রথম ধাপ অতিক্রম করতে পারবে তো?

নাকি গ্রুপ পর্বের প্রাচীর টপকে দ্বিতীয় পর্বে উঠে আসাই হবে সার? নানা হিসেব, নিকেশ। জল্পনা-কল্পনার ফানুস উড়ছে আকাশ-বাতাসে। পজিশন অনুযায়ী দু’দলের অবস্থান কি? কার শক্তি-সামর্থ্য কেমন? কে কোথায় এগিয়ে? কার প্লাস পয়েন্ট কি, আবার কোন দল কোথায় পিছিয়ে, কার ঘাটতির জায়গাগুলো কোথায়? এসব নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বড় বড় বোদ্ধা, বিশেষজ্ঞ ও পন্ডিতরা দু’দলের শক্তি, সামর্থে্যর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।

ভক্তদের বড় অংশ অবশ্য অতসব কিছুর ধার ধারেন না। সমর্থকদের বড় অংশ আবেগপ্রবণ। তারা কে কি বললো, তা নিয়ে বেশি মাথা ব্যাথা ঘামাতে নারাজ। তাদের কাছে প্রিয় দলের শক্তি, সামর্থ্য, ঘাটতি, দূর্বলতা, প্লাস ও মাইনাস পয়েন্টের চেয়ে ভালবাসা আর আবেগ বড়। তাই ভক্তদের কাছে ফুটবলীয় যুক্তি-ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ তত গুরুত্ব পায় না।

তারপরও কথা হচ্ছে। নানা সমীকরণ উঠে আসছে। বলা হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স দুই দলের আক্রমণভাগই প্রায় সমান ধারালো। সময়ের সেরা বল প্লেয়ার- প্লেমেকার লিওনেল মেসি আর্জেন্টাইনদের প্রাণভোমরা। তার রচে দেয়া উৎস থেকে গড়ে উঠছে আক্রমণ। সার্জিও আগুয়েরো, গনজালো হিগুয়াইন, পাওলো দিবালা আর ডি মারিয়ার মত দ্রুতগতির ক্ষিপ্র ফরোয়ার্ডরা সেসব বাড়িয়ে দেয়া বল ধরে যে কোন দলের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে সক্ষম।

একই ভাবে ফরাসী আক্রমণ ভাগেও আছেন গ্রিজম্যান, এমবাপে, জিরু, ডেম্বেলে, থাউবিন ও থমাস লেমেরের মত তুখোড় ফরোয়ার্ডরা। মেসির মত অত দক্ষ না হলেও নিজেদের মাঝমাঠ ও প্রতিপক্ষ সীমানার মাঝামাঝি জায়গা থেকে আক্রমণের উৎস গড়ে দেয়ার কাজটি ভালই করেন পল পগবারা।

কাজেই ধারণা করা হচ্ছে গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল দেখবে আজ ফুটবল বিশ্ব। সে আক্রমণ থেকে কোন পক্ষ গোল আদায় করে নিতে পারবে, কারা জয়ীর বেশে মাঠ ছেড়ে আবার কোয়ার্টারফাইনাল খেলবে? সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

দু’দলের শক্তি ও সম্ভাবনা যাচাই করতে গিয়ে সংস্কারবাদীদের কেউ কেউ আবার ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এই পর্বে সাদা-আকাশী জার্সিধারীদের রেকর্ড কি? আর্জেন্টিনা শেষ কবে সেরা ষোল থেকে বিদায় নিয়েছে? ফরাসীরাই বা এই জায়গায় এসে কতবার উৎরে গেছে আর কোনবার ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরেছে? এসওব ঘাঁটাঘাটি চলছে।

ইতিহাস জানাচ্ছে, সেই ১৯৩০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফুটবলের রানার্সআপ আর্জেন্টিনা এবার নিয়ে মোট ১৭বার বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেছে। তবে দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ট্র্যাক রেকর্ড জার্মানি আর ব্রাজিলের মত সমৃদ্ধ নয়। ওঠা-নামা আছে প্রচুর। যেমন ১৯৩০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নেমে রানার্সআপ হওয়া দলটি দ্বিতীয়বার, মানে ১৯৩৪ সালে প্রথম পর্ব থেকেই বাদ পড়েছিল। এরপর ১৯৩৮, ১৯৫০ ও ১৯৫৪- পরপর তিন আসরে মূল পর্বে যেতেই পারেনি তারা।

১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে গ্রপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে। ১৯৬৬-তে কোয়ার্টারফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায়। ১৯৭০-এ ব্রাজিল যখন তৃতীয় বারের মত বিশ্বসেরার অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করে, সেবার আর্জেন্টিনা মূল পর্বেই পৌঁছাতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে বিদায় নেয় দ্বিতীয় পর্ব থেকে।

তবে এখনকার মত তখন দ্বিতীয় পর্ব নকআউট ভিত্তিতে ছিল না। সেখানেও গ্রুপ পদ্ধতিতে খেলা হয়েছে। সেবার দ্বিতীয় পর্বে নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল ও পূর্ব জার্মানির সাথে চার দলের মধ্যে চতুর্থ স্থান জোটে আর্জেন্টাইনদের। নেদারল্যান্ডস ( ৪-০ ) ও ব্রাজিলের (১-২) কাছে হার এবং পূর্ব জার্মানির সাথে ১-১ গোলে ড্র করা আর্জেন্টিনার পক্ষে আর দ্বিতীয় পর্বের বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৮ সালে নিজ মাটিতে চ্যাম্পিয়ন হয় ম্যারিও ক্যাম্পেসের আর্জেন্টিনা।

১৯৮২ সালে দ্বিতীয় পর্ব থেকে বাদ পড়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার দল। ইতালি ও ব্রাজিলের সাথে খেলা ছিল দুটি ম্যাচেই হার; ইতালির কাছে ২-১ আর ব্রাজিলের কাছে ৩-১ গোলে হেরে বিদায়। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে দারুণ খেলে চ্যাম্পিয়ন। চারবছর পর ১৯৯০ সালে ইতালির মাটিতে ফাইনালে উঠেও জার্মানদের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ।

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ দলের লড়াই থেকে বিদায় নেয় তারা। ১৯৯৮ সাল ফ্রান্সে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা। ২০০২ কোরিয়া ও জাপানের মাটিতে গ্রুপ থেকেই বিদায়। ২০০৬ জার্মানি ও ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় পরপর দুই আসরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে রানার্সআপ ।

ওপরের ইতিহাস ও পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ঠিক দুই যুগ আগে ১৯৯৪ সালে শেষবার সেরা ষোলোর লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। সেবার রুমানিয়ার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল। মাঝের পাঁচ আসরে একবারের জন্যও দ্বিতীয় পর্ব থেকে বাদ পড়ার নজির নেই আর্জেন্টাইনদের।

অন্যদিকে ফরাসিদের পরিসংখ্যান ভিন্ন। এখন পর্যন্ত ফরাসিরা ১৫বার বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নিলেও এই সেরা ষোলো বা ‘রাউন্ড অফ সিক্সটিন’ থেকে বাদ পড়েছে মোটে একবার। সেটাও সেই ৮৪ বছর আগে; ১৯৩৪ সালে। তারপর ফ্রান্স আর কখনো সেরা ষোলর লড়াইয়ে হার মানেনি। এরপর ১৯৩৮ এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে বিদায় নিয়েছে ফরাসীরা।

আর ১৯৫৮, ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে তিন তিনবার সেমির যুদ্ধে হার মানা ফরাসিরা সেমির বাঁধার প্রাচির টপকে প্রথমবার ফাইনাল খেলেছে ঘরের মাঠে ১৯৯৮ সালে।

সেবার বিজয়ীও হয় ফরাসীরা। আর ২০০৬ সালের ফাইনাল খেললেও শেষ রক্ষা হয়নি। ইতালির কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এছাড়া (১৯৩০, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৭৮, ২০০২, ২০১০) ছয়বার গ্রুপ বা প্রথম পর্ব থেকেই বাদ পড়েছে ফ্রান্স। তার মানে সেই ১৯৩৪ সালের পর আর কখনো ‘রাউন্ড অফ সিক্সটিন’ থেকে বিদায় নেবার নজির নেই ফরাসিদের।

আর আর্জেন্টিনা ঠিক এই জায়গায় এসে শেষবার হারের তেতো স্বাদ নিয়ে বাদ পড়েছিল ১৯৯৪ সালে। আর্জেন্টইন সমর্থকদের যে অংশটা সংস্কার মানেন , বিশ্বাস করেন- তাদের জন্য খানিক চিন্তার খোরাক কিন্তু আছে। দুই যুগ আগে এই সেরা ষোলোর লড়াইয়ে সাদা ও আকাশি জার্সির বিদায় ঘটেছিল এক ইউরোপীয় দল, গিয়র্গি হ্যাজির রোমানিয়ার কাছে হেরে। সেবার ৩-২ গোলে হার মেনেছিল আর্জেন্টিনা। এবার সেই সেরা ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার সামনে প্রতিপক্ষ ইউরোপের আরেক দল ফ্রান্স।

এবার কি করবে আর্জেন্টাইনরা? আবারো ইউরোপে স্বপ্ন ভঙ্গ হবে মেসিদের? নাকি ইতিহাস পাল্টে ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত শক্তি ফ্রান্সকে পিছনে ফেলে সেরা আটে নাম লিখাবে লিওনেল মেসিরা? দেখা যাক- কে এগিয়ে যায়, আর কোন দলের জয়রথ থামে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com